সম্পত ঘোষ (Sampat Ghosh)
পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় বঙ্গোপসাগর উপকূলে অবস্থিত তাজপুর পশ্চিমবঙ্গের সৈকত পর্যটনের তুলনামূলক নতুন সংযোজন। দ্বাদশ পরিকল্পনা অনুসারে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত যে চারটি পর্যটন বর্তনী (Circuit) শনাক্তকরণ করা হয়েছিল তার মধ্যে প্রথমটি সৈকত কেন্দ্রিক (দীঘা -শঙ্করপুর - তাজপুর - জুনপুট - মন্দারমনি) আর আমাদের গন্তব্য তাজপুর, জেলে বসতির উপর আধারিত এই পর্যটন কেন্দ্র। বারাসাত থেকে সকাল ৮ টায় রওনা হয়ে জাতীয় সড়ক ১৬ আর ১৬a ধরে কোলাঘাট-নন্দকুমার-কণ্টাই-চালখোলা-বালিসাই হয়ে প্রায় ১৮৮ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে যখন তাজপুর পৌঁছলাম তখন বেলা ১ টা।
মাছের ভেরী, শালুকের জলা পার হয়ে সোজা পৌঁছলাম সমুদ্রের পাড়ে। অচেনা অতিথিদের উপস্থিতি লক্ষাধিক লাল কাঁকড়া পরিবারকে একটু বিচলিত করলো, লক্ষ্য করলাম আমাদের পায়ের শব্দে একটু বিরাম পড়েছিল তাদের ব্যস্তময় দৈনন্দিন কাজে। দিনের অনেকটা সময় তারা তাদের বাসস্থান বালির গর্তগুলো পরিষ্কার রাখতে বা রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্যয় করে। গর্তের মুখ থেকে প্রায় ১ ফুট দূর পর্যন্ত বালি বয়ে এনে ফেলে যায়। দীঘা উপকূল বরাবর ৩০ টির ও অধিক প্রজাতির কাঁকড়া পাওয়া যায়। বর্ণময়তা আর সংখ্যাধিক্যের কারণে লালকাঁকড়া পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্র। আমরা এগিয়ে গেলাম সমুদ্রের আরও কাছে, বিশালতার এই অপরূপ হাতছানিকে উপেক্ষা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ভাঁটা চলছে, তাই অনেকটা দূর যেতে হলো সমুদ্র স্পর্শ করতে। এবার একটু যেতে হবে পাড়ের দিকে, থাকার সংস্থান আর দ্বিপ্রাহরিক আহার, আর তারপরেই আবার ফিরবো।
আগেই বলেছি তাজপুর পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন মানচিত্রে নতুন সংযোজন। সৌন্দর্যায়নের কাজ চলছে, তার নমুনা সর্বত্র বিদ্যমান, কোথাও ক্রেন দাঁড়িয়ে, কোথাও বা খানিকটা সিঁড়ি তৈরি হয়েছে, আবার কোথাও রিসোর্ট তৈরির কাজ চলছে। আজ যেখানে জেলে ডিঙিগুলি নোঙ্গর করা রয়েছে , অদূর ভবিষ্যতে সেখানেই গড়ে উঠবে বন্দর।
দীঘার পরিচিত হোটেল সংস্কৃতি থেকে একটু আলাদা তাজপুর। এখানে অধিকাংশই কুটীর (Cottage) জাতীয় আবাসন। বিশালাকায় উন্নত অট্টালিকার পরিবর্তে বেশ সুন্দর বাগান, ছোট্ট পার্ক নিয়ে গড়ে ওঠা কুটীরগুলি একদণ্ড শান্তির জন্যে আদর্শ। পাড়ের কাছে রয়েছে গোটা চব্বিশেক দোকান, বাঁশের কাঠামো, টিন আর পাতার ছাউনি। পছন্দ মতন রান্না করিয়ে খাওয়ার বন্দোবস্ত আছে সেগুলিতে। পমফ্রেট, ভেটকি, ভোলা, পার্শে, কাঁকড়া, দেশী মুরগি সবই মিলবে বাঙালির রসনা তৃপ্ত করতে। সমুদ্রের তীর ধরে হেঁটে যেতে যেতে কিছুটা দূর গিয়ে আবারও দেখা মেলে এইরকম আরও কয়েকটি দোকানের। প্রধানত স্থানীয় লোকেরা এই দোকানগুলি চালান। স্থানীয় জনজাতির জীবিকা মূলত মাছধরা বা মৎস পালন। তবে বর্তমানে অনেকেই পর্যটন শিল্পের সাথে যুক্ত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন পেশাকে বেঁছে নিয়েছেন। পর্যটন বাড়ার সাথে সাথে স্থানীয় অর্থনীতির উন্নতির একটা ইতিবাচক সম্পর্ক চোখে পড়লো, বেশ ভালো লাগলো।
একটু দূরেই রয়েছে মৎসকোঠি। প্রায় ৩০০ পরিবার এখানে মাছ শুকানোর (যা 'শুটকি মাছ' বলেই আমাদের কাছে পরিচিত) কাজে যুক্ত আছেন। বেশ অনেকগুলি পরিবারের সাথে কথা হলো। জানলাম তাঁদের জীবনধারণের কথা। আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত তাঁরা শুটকি মাছের কাজে নিযুক্ত থাকেন আর অন্য সময়ে আলাদা কাজ বা ছোটোখাটো ব্যবসা করেন। বুমলা, রুপা পাইত্যা, চিংড়ি, কাঁকড়া ইত্যাদি প্রধানত শুকানো হচ্ছে। শুনলাম, কয়েকদিন আগের (১৬ থেকে ১৯ শে অক্টোবর, ২০১৭) বঙ্গোপসাগরের উপরের ঘূর্ণাবর্তের ফলে যে জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল তাতে শুটকি মাছের এবং স্বভাবতই তাদের জীবিকার খুব ক্ষতি হয়েছে।
উন্নয়ন সর্বদা কাম্য। তবে অবশ্যই পর্যবেক্ষণ জরুরি, প্রাকৃতিক উপাদানের বিনাশ বাঞ্ছনীয় নয়। লাল কাঁকড়ারা অবলুপ্ত হবে না, কচ্ছপের ডিম খুঁজে পাওয়া দুঃসাধ্য হবে না, ঝাউ আর কেয়ার জঙ্গল অদৃশ্য হয়ে যাবে না, ঐতিহ্যের সাথে বর্তমানের একীকরণ (Integration) হবে -- এগুলিই হোক উন্নয়নের পরিমাপ, সেটাই আদর্শ সাস্টেনেবল উন্নয়ন (Sustainable development)। এবার ফিরতে হবে, তবে আবার আসবো। জানতে আসবো লালকাঁকড়ারা কেমন আছে, শুটকির উপর আঁশখোসি পোকার উপদ্রব কমলো কিনা, আর নাম না জানা ছেলেটার সাথে কচ্ছপের ডিম খুঁজতে যাবো তখন।
অক্টোবর, ২০১৭
দক্ষিণ কোরিয়ার একটি মৎস বন্দর ইয়ংদক ক্র্যাব ভিলেজ-র ভ্রমণ পড়ার জন্য ক্লিক করুন।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন